মূল বিষয়বস্তুতে যান
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · রিয়াদ
العربيةEnglishনিউজলেটারযোগাযোগ
সৌদি আরব

জাতি গঠনে বাদশাহ আবদুলআজিজের জ্ঞান ও ঐতিহ্য চর্চার গুরুত্ব

সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুলআজিজ দেশ গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তারকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আজেল বাংলা58 মিনিট আগে · 3 মিনিট পড়া
বাদশাহ আবদুলআজিজের সময় সৌদি আরবে ছাপাখানা

মূল বিষয়

AI

সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুলআজিজ বিন আবদুর রহমান আল সৌদ (রহ.) দেশ গঠনের মূল ভিত্তি হিসেবে সাংস্কৃতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের একীকরণের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই তিনি দেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিকাশে মনোযোগী হন। সে সময় দেশটি কেতাব ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যুগ থেকে বেরিয়ে একটি আধুনিক, ঐক্যবদ্ধ ও জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের জন্য প্রথম ধাপ তৈরি করছিল। বাদশাহ আবদুলআজিজের লক্ষ্য ছিল শিক্ষা, জ্ঞান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তিতে দেশের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা।

প্রথম থেকেই বাদশাহ আবদুলআজিজ ছাপাখানা ও প্রকাশনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি নিজের খরচে সৌদি আরবসহ মিশর, ভারত ও শামে শত শত ধর্মীয়, ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক বই ছাপিয়ে বিতরণ করেন। এ জন্য তিনি মক্কায় 'উম্মুল কুরা' ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যাতে এসব বই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং ইসলামী সংস্কৃতি জোরদার হয়।

জ্ঞানচর্চার এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ছিল জাতির মধ্যে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জ্ঞানের বিস্তার এবং আরব-ইসলামী ঐতিহ্যের সেবা। বাদশাহ আবদুলআজিজের খরচে মিশরের 'আল-মানার' ও ভারতের ছাপাখানায় বহু গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী বই ছাপা হয় (যেমন: ইবন গনামের ইতিহাস, ইবন সেহমানের কবিতার সংকলন)। এছাড়া 'উম্মুল কুরা' পত্রিকা রাষ্ট্রের সরকারি গেজেট হিসেবে প্রকাশিত হয় এবং পরে শিক্ষা অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে আরও কিছু পত্রিকা ও সাময়িকী (যেমন 'আল-ইসলাহ') প্রকাশিত হয়।

বাদশাহ আবদুলআজিজের আমলে মক্কায় সরকারি ছাপাখানা (আমিরিয়া) আধুনিকায়ন করা হয় এবং ছোট ছোট বেসরকারি ছাপাখানা কিনে সরকারি ছাপাখানার সঙ্গে একীভূত করা হয়। ছাপাখানার কিছু কর্মীকে মিশরে পাঠানো হয় প্রশিক্ষণের জন্য। মক্কায় আরও কিছু ছাপাখানা গড়ে ওঠে—যেমন মাজিদিয়া ও আরাবিয়া ছাপাখানা। মদিনায় ১৯৩৬ সালে মিশর থেকে আমদানি করা ছাপাখানা স্থাপন করা হয়। জেদ্দায় তখন তিনটি ছাপাখানা ছিল: আরব কোম্পানি ছাপাখানা, পূর্ব ছাপাখানা ও ফাতহ ছাপাখানা।

বাদশাহ আবদুলআজিজের শাসনামলে দুই দফা মুদ্রণ আইন জারি হয়—প্রথমটি ১৯২৮ সালে এবং দ্বিতীয়টি ১৯৩৯ সালে। তিনি মক্কা, জেদ্দা ও মদিনার ছাপাখানার জন্য কাগজ ও যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক মওকুফের নির্দেশ দেন।

বাদশাহ আবদুলআজিজের খরচে ছাপা বইগুলোর মধ্যে ছিল ধর্মীয়, সাহিত্যিক ও ঐতিহ্যবাহী বই, কোরআন তাফসিরসহ নানা বিষয়। এসব বই মক্কার উম্মুল কুরা ও সালাফিয়া ছাপাখানা ছাড়াও ভারত, মিশর ও শামের ছাপাখানায় ছাপা হয় ১৯১৭ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। এ সময় ১০০টির বেশি বই ছাপা হয়, যার মোট কপি ছিল ১ লাখের বেশি। কিছু বই আরবি ছাড়াও হিন্দি, জাভানিজসহ অন্যান্য ভাষায় প্রকাশিত হয় এবং কিছু বই গবেষণা ও সম্পাদনার মাধ্যমে ছাপা হয়।

এই বইগুলোর মধ্যে রয়েছে: ইবন গনামের ইতিহাস (রওদাতুল আফকার ওল আফহাম), সুলাইমান ইবন সেহমানের কবিতার সংকলন, ইবন সেহমানের আরও কিছু বই, যেমন 'আস-সাওয়াইকুল মুরসালা আশ-শাহাবিয়া', ইবন কাসিরের ইতিহাস (আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া, ১৪ খণ্ড), আবদুল্লাহ ইবন কুদামার 'আল-মুগনি', আবদুর রহমান ইবন কুদামার 'আল-শারহুল কবির', ইবন কাসিরের তাফসির, ইবন কাইয়িম আল জাওজিয়ার 'রওদাতুল মুহিব্বিন ও নুজহাতুল মুশতাকিন', ১৯৩৫ সালের হজ নিয়ে 'যিকরা আল-কাশাফা আল-ইরাকিয়া', ইবন খুজাইমার 'কিতাব আত-তাওহিদ', ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত, এবং আবু বকর ইবন মুহাম্মদ আল-আজরির 'আশ-শারিয়া', ১৯৫০ সালে প্রকাশিত, ও 'মাজমুয়াত আত-তাওহিদ'।

'আদ-দারা' সাময়িকীতে প্রকাশিত 'বাদশাহ আবদুলআজিজের বই প্রকাশে আগ্রহ' শীর্ষক গবেষণায় অধ্যাপক আবদুলআজিজ আর-রিফাই উল্লেখ করেন, বাদশাহ আবদুলআজিজের খরচে মিশরে বহু বই ছাপা হয়েছে—যেমন: ইবন জারিরের তাফসির, বাগভির তাফসির, ফিকহের 'আল-মুগনি', 'আল-শারহুল কবির' এবং আরও কিছু হাদিস ও তাওহিদের বই, ইবন কাসিরের তাফসির।

রিফাই আরও বলেন, বাদশাহ আবদুলআজিজের প্রচেষ্টা শুধু ভারত ও মিশরেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং শামেও তাঁর উদ্যোগ ছিল। যেমন, ইমাম ইবন কাইয়িম আল জাওজিয়ার 'রওদাতুল মুহিব্বিন ও নুজহাতুল মুশতাকিন' বইটি দামেস্কের তারাক্কি ছাপাখানায় ছাপা হয়। রিফাই তাঁর গবেষণায় বাদশাহ আবদুলআজিজের খরচে ছাপা ১০৮টি ঐতিহ্যবাহী বইয়ের তালিকাও তুলে ধরেছেন।

বাদশাহ আবদুলআজিজের এই বৃহৎ উদ্যোগ সৌদি আরবের সাংস্কৃতিক ভিত্তি গড়ে তোলে এবং দেশের জ্ঞানভিত্তিক অগ্রযাত্রার মজবুত ভিত্তি স্থাপন করে, যার ধারাবাহিকতায় সৌদি আরব আজ আরব, ইসলামি ও বৈশ্বিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত অবস্থান অর্জন করেছে।

মন্তব্য (0)