নিরাপত্তা ও ইতিহাস সম্মেলনে সৌদি ঐতিহ্যের সভ্যতাগত দিক
নিরাপত্তা ও ইতিহাস সম্মেলনে সৌদি আরবের ঐতিহ্যের সভ্যতাগত দিক ও প্রাচীন নিদর্শন নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
মূল বিষয়
AI‘নিরাপত্তা ও ইতিহাস ২০২৬’ সম্মেলনের এক বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে সৌদি আরবের ঐতিহ্যের সভ্যতাগত দিক ও দেশটির সমৃদ্ধ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন তুলে ধরা হয়, যা সৌদি আরবের গভীর ইতিহাস ও মানব সভ্যতার ধারাবাহিকতায় এর গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানকে প্রমাণ করে।
‘সৌদি আরবের ঐতিহ্যের সভ্যতাগত দিক’ শীর্ষক বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধে প্রত্নতত্ত্ব ও প্রাচীন ভাষার অধ্যাপক ড. সাঈদ বিন ফায়েজ আল-সাঈদ সৌদি আরবে আবিষ্কৃত গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নিয়ে আলোচনা করেন, যা দেশটির বিভিন্ন সভ্যতাগত পর্যায়ের পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরে।
ড. সাঈদ জানান, প্রত্নতাত্ত্বিক খনন ও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সৌদি আরবে মানুষের উপস্থিতি ছিল প্রায় ১৩ লাখ বছর আগে থেকেই। তিনি জওফ অঞ্চলের শুইহাটিয়া ও নাজরানে পাওয়া কিছু পাথরের সরঞ্জামের কথা উল্লেখ করেন, যেগুলোর ইতিহাস প্রায় ১০ লাখ বছর পুরোনো। এসব আবিষ্কার প্রাচীন যুগে সরঞ্জাম তৈরির কৌশল ও ব্যবহারের অগ্রগতি নির্দেশ করে।
তিনি বলেন, তাবুক অঞ্চলে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, আরব উপদ্বীপে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার বছর আগে থেকেই উটের উপস্থিতি ছিল। এসব আবিষ্কার ওই সময়ের জীবনযাত্রা ও পরিবেশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয়।
তিনি ‘নাফুদ আঙুল’ নামে পরিচিত একটি বিরল মানবদেহাবশেষের কথাও উল্লেখ করেন, যার ইতিহাস প্রায় ৮৫ হাজার বছর আগের। এটি উত্তর সৌদি আরবের নাফুদ মরুভূমির এক প্রাচীন হ্রদের পাড়ে পাওয়া গেছে।
এছাড়া, তিনি হাইল অঞ্চলের ‘সাহুত’ নামক স্থানের কথা বলেন, যেখানে প্রায় ১৩ হাজার বছর আগের পাথর শিল্পের বিকাশ ও বহুমুখী ব্যবহারের নিদর্শন পাওয়া গেছে। এখান থেকেই সৌদি আরবে শিল্পকলার এক প্রাথমিক ধারা গড়ে ওঠার ইঙ্গিত মেলে।
ড. সাঈদ জানান, প্রায় ১১ হাজার বছর আগে আরব উপদ্বীপে বড় ধরনের জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জনবসতি ও ভৌগোলিক কাঠামোতে পরিবর্তন আসে, গড়ে ওঠে গ্রাম ও মানববসতি। এর মধ্যে ‘মাসিউন’ (প্রায় ১১ হাজার বছর পুরোনো), খাইবারের ‘নাতাতা’ (প্রায় ৬ হাজার বছর) এবং তাবুকের ‘করিয়া’ (প্রায় ৫ হাজার বছর) উল্লেখযোগ্য, পাশাপাশি আল-উলা ও ইয়ামামার আরও কিছু প্রাচীন স্থান রয়েছে।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় তায়মা, আল-উলা, হিজর, হিজর (হাফুফের কাছে), নাজরান, দুমা আল-জান্দাল, ফাও ও হিজরের মতো বহু প্রাচীন শহর ও সভ্যতার কেন্দ্র চিহ্নিত হয়েছে। এগুলো আরব উপদ্বীপের সভ্যতাগত কাঠামোর মূল উপাদান এবং এখানকার মানুষের সভ্যতা গড়ে তোলার ও জীবনযাত্রার বিকাশে অবদান রেখেছে।
তিনি জানান, ওইসব সমাজে শিল্প ছিল সভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, ৮ হাজার বছরেরও বেশি আগে এখানকার মানুষ মাটি দিয়ে ব্যবহারিক সরঞ্জাম তৈরি করত এবং পরে হাতে তৈরি মৃৎশিল্প থেকে চাকা ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত উন্নতি ঘটে, যা শিল্পকৌশলে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনে।
এছাড়া, প্রায় ৪ হাজার বছর আগে লোহা গলানোর প্রযুক্তি আবিষ্কৃত হয়, যার ফলে বিভিন্ন শিল্প, যেমন সরঞ্জাম, অস্ত্র, অলঙ্কার ও ওষুধ তৈরিতে অগ্রগতি ঘটে।
ড. সাঈদ আরও বলেন, সৌদি আরবে বিপুল পরিমাণ শিলালিপি ও শিলাচিত্র রয়েছে, যা আরব উপদ্বীপে মানবজীবনের এক চাক্ষুষ দলিল। এসব শিল্পকর্মে উচ্চমানের শৈল্পিক প্রকাশ, অনুপাত ও দৃষ্টিকোণ বজায় রাখা হয়েছে। এখানে প্রায় ১০ হাজার বছর আগের এক প্রাচীন ভাস্কর্য বিদ্যালয়েরও নিদর্শন পাওয়া যায়, যার প্রভাব প্রাচীন পূর্বাঞ্চলের শিল্পকলায় পড়েছে।
ড. সাঈদ তাঁর প্রবন্ধের শেষে সৌদি আরবের প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের গুরুত্ব ও এর ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সভ্যতাগত মূল্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সৌদি সরকার ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্বকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে এবং এগুলোকে ‘ভিশন ২০৩০’-এর অগ্রাধিকার হিসেবে নিয়েছে, কারণ এসবের রয়েছে জ্ঞানগত, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব এবং সৌদি আরবের সভ্যতাগত গভীরতা ও মানব ইতিহাসে অবদান তুলে ধরার ভূমিকা।
