মূল বিষয়বস্তুতে যান
বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ · রিয়াদ
العربيةEnglishনিউজলেটারযোগাযোগ
সৌদি আরব

সৌদি জাতীয় দিবসে উন্নয়ন ও পরিবর্তনের বছরগুলোর উদযাপন

২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সৌদি আরব উদযাপন করছে ৯৬তম জাতীয় দিবস, ঐক্যের ইতিহাস স্মরণ ও আধুনিক উন্নয়নের ধারাবাহিকতা তুলে ধরে।

আজেল বাংলা1 ঘণ্টা আগে · 5 মিনিট পড়া
সৌদি জাতীয় দিবসের উদযাপন ও দেশের উন্নয়ন

মূল বিষয়

AI

আজ বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সৌদি আরব উদযাপন করছে জাতীয় দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের গৌরব আমাদের স্বভাবেই’। দিনটি স্মরণ করিয়ে দেয় বাদশাহ আবদুলআজিজ বিন আবদুর রহমান আল সৌদের নেতৃত্বে দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং চলমান উন্নয়ন ও অগ্রগতির যাত্রা, যা এখন চলছে বাদশাহ সালমান ও যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমানের নেতৃত্বে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে পরিবর্তনের পরিধি বিস্তৃত হয়েছে অর্থনীতি, সরকারি সেবা, প্রযুক্তি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও পরিবেশে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয়েছে। ২০১৬ সালে ঘোষিত ‘ভিশন ২০৩০’ দেশের উন্নয়ন, সরকারি কার্যক্রম ও অর্থনীতির নতুন রূপরেখা হিসেবে কাজ করছে।

সরকারি সংস্কার ও ভবিষ্যতের দৃষ্টি

২০১৫ সালের জানুয়ারিতে বাদশাহ সালমান ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকারি কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কার হয়। বেশ কিছু কমিটি ও উচ্চপর্যায়ের পরিষদ বাতিল করা হয় এবং গঠন করা হয় রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক পরিষদ এবং অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন পরিষদ। মন্ত্রণালয় পুনর্গঠন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা এবং ব্যয় দক্ষতা ও জাতীয় রূপান্তরের জন্য বিশেষ সংস্থা গড়ে তোলা হয়।

২০১৬ সালের এপ্রিল মাসে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উপস্থাপনায় ‘ভিশন ২০৩০’ গৃহীত হয়। এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার এবং জাতীয় উন্নয়নের বিস্তৃত কাঠামো। পরবর্তী বছরগুলোতে বিভিন্ন খাতে নতুন উদ্যোগ ও প্রকল্প শুরু হয়। নারীর কর্মসংস্থান ও নেতৃত্বে অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক সংস্কারও হয়েছে।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতা পৌঁছেছে দুর্নীতি দমন ও স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতেও। ২০১৭ সালে যুবরাজের নেতৃত্বে গঠিত হয় দুর্নীতি দমন উচ্চপর্যায়ের কমিটি।

বৈচিত্র্যময় অর্থনীতি ও বাড়তে থাকা বিনিয়োগ

অর্থনৈতিকভাবে সৌদি আরব আয়ের উৎস বৈচিত্র্যকরণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অ-পেট্রোলিয়াম খাতের ভূমিকা বাড়াতে কাজ করছে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তুলতে নানা প্রকল্প ও উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের ২০২৬ সালের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বার্ষিক প্রতিবেদনে সৌদি আরব বিশ্বে ১৩তম এবং জি-২০ দেশগুলোর মধ্যে ৩য় স্থানে উঠে এসেছে, যা আগের বছরের চেয়ে চার ধাপ এগিয়ে।

২০২৫ সালে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগের নিট প্রবাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৬ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৫৩% বেশি।

প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতেও ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। রিয়াদে ‘লিপ ২০২৬’ সম্মেলনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত প্রযুক্তিতে ১৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ ও অংশীদারিত্বের ঘোষণা আসে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা ও নৈতিকতা কেন্দ্রের মূলনীতি অনুমোদিত হয়েছে।

ডিজিটাল সরকার: সেবায় রূপান্তর

অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশনও বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ডিজিটাল সরকার পরিপক্বতা সূচকে সৌদি আরব ১৯৭ দেশের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করেছে।

এছাড়া, সৌদি ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্তৃপক্ষ ‘সদাইয়া’ জাতিসংঘের ২০২৬ সালের পাবলিক সার্ভিস পুরস্কার পেয়েছে ‘জাতীয় ডেটা ব্যাংক’ ও ‘ইস্তিশরাফ’ প্ল্যাটফর্মের জন্য, তথ্য বিনিময় ও বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষতা বৃদ্ধির স্বীকৃতিস্বরূপ।

পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন

পরিবেশ রক্ষায় ‘সৌদি গ্রিন ইনিশিয়েটিভ’-এর আওতায় প্রথম এক মিলিয়ন হেক্টর ক্ষয়িষ্ণু জমি পুনর্বাসনের ঘোষণা এসেছে। জাতিসংঘের ‘বিশ্বসেরা ভূমি পুনরুদ্ধার’ পুরস্কারও পেয়েছে সৌদি আরব, উদ্ভিদ আচ্ছাদন বৃদ্ধি, জমি পুনরুদ্ধার, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার জন্য।

এছাড়া, আসির, আল-বা’হা ও মক্কা অঞ্চলে ৮,৫৮১টি স্থাপত্য ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে জাতীয় স্থাপত্য ঐতিহ্য নিবন্ধনে যুক্ত করা হয়েছে, যা ৫০ হাজার স্থাপত্য ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যের অংশ।

মানুষই উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু

পরিবর্তন শুধু অর্থনীতি বা সেবাতেই সীমাবদ্ধ নয়, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমাজেও উন্নয়নমূলক নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিবার, তরুণ ও উদ্যোক্তাদের সহায়তায়ও নেওয়া হয়েছে নানা পদক্ষেপ।

সামাজিক উদ্যোগের মধ্যে রয়েছে মোহাম্মদ বিন সালমান ফাউন্ডেশন ‘মিসক’, ‘সানাদ মোহাম্মদ বিন সালমান’ কর্মসূচি এবং ঐতিহাসিক মসজিদ উন্নয়ন প্রকল্প। শিক্ষা খাতে নতুন আইন পাস হয়েছে, যার লক্ষ্য সুশাসন, শিক্ষার মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন খাতের ভূমিকা নির্ধারণ।

বিজ্ঞান ক্ষেত্রে, ২০২৬ সালের ‘আইএসইএফ’ প্রদর্শনীতে সৌদি শিক্ষার্থীরা ২৪টি পুরস্কার পেয়েছে—এর মধ্যে ১২টি প্রধান ও ১২টি বিশেষ পুরস্কার। কম্পিউটেশনাল বায়োলজি ও ইনফরমেটিক্সে সৌদি আরব বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।

জেদ্দায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে সৌদি শিক্ষার্থীরা দুটি স্বর্ণ, একটি রৌপ্য ও একটি ব্রোঞ্জ পদকসহ একাধিক ব্যক্তিগত পুরস্কার জিতেছে।

হারামাইন ও হজযাত্রীদের সেবায় যত্ন

মক্কা ও মদিনার পবিত্র মসজিদ এবং হজযাত্রীদের সেবায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মসজিদুল হারামের তৃতীয় সম্প্রসারণ, মক্কা ও পবিত্র স্থানগুলোর জন্য রাজকীয় কমিশন গঠন এবং ‘ভিশন ২০৩০’-এর আওতায় ‘হজযাত্রী সেবা’ কর্মসূচি চালু হয়েছে।

‘মক্কা রোড’ উদ্যোগ সম্প্রসারিত হয়ে পাকিস্তানের লাহোরে তৃতীয় কেন্দ্র চালু হয়েছে, যাতে হজযাত্রীরা সৌদি আরবে আসার আগেই নিজ দেশে আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে পারেন।

আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তায়ও সৌদি আরব সক্রিয়। গাজা উপত্যকায় ত্রাণ, ইয়েমেনে উন্নয়ন ও পুনর্গঠনে সহায়তা এবং জাতিসংঘের আর্থিক ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম অনুযায়ী, মানবিক সহায়তায় বিশ্বে দ্বিতীয় ও আরব বিশ্বে প্রথম স্থান অর্জন করেছে।

আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব

দেশের অভ্যন্তরীণ উন্নয়নের পাশাপাশি সৌদি আরব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব সম্প্রসারণ করেছে।

২০২৫ সালের নভেম্বরে যুবরাজের যুক্তরাষ্ট্র সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সৌদি-আমেরিকা শীর্ষ সম্মেলন হয়, যেখানে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

২০২৬ সালের আগস্টে যুবরাজের ফ্রান্স সফরে অনুষ্ঠিত হয় সৌদি-ফরাসি কৌশলগত অংশীদারিত্ব পরিষদের প্রথম বৈঠক এবং যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প নিয়ে গোলটেবিল বৈঠক।

এছাড়া, সাম্প্রতিক সময়ে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বৈঠক, উপসাগরীয় সহযোগিতা জোরদার এবং সৌদি- কাতার দ্রুতগতির ট্রেন প্রকল্পসহ বাহরাইন-সৌদি সমন্বয় পরিষদের আওতায় নানা চুক্তি ও সমঝোতা হয়েছে।

২০২৬ সালের আগস্টে মক্কায় অনুষ্ঠিত হয় সৌদি, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে যৌথ প্রতিরক্ষা শীর্ষ সম্মেলন, যেখানে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়।

নাগরিকদের জীবনে প্রভাব ফেলেছে এমন সিদ্ধান্ত

সাম্প্রতিক সময়ে নাগরিকদের সেবা ও চাহিদা সংশ্লিষ্ট নানা নিয়ন্ত্রক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াদে বাড়িওয়ালা-ভাড়াটিয়া সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণে নতুন আইন এবং আবাসন সহায়তা কর্মসূচির জন্য নির্ধারিত জমি উন্নয়ন সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত সংশোধন, যাতে সরবরাহ বাড়ানো ও বেসরকারি খাতের অংশীদারিত্ব বাড়ানো যায়।

এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য সেবা উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, অবকাঠামো প্রকল্প এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জীবনমান উন্নয়ন।

ঐক্যের উত্তরাধিকার থেকে ভবিষ্যতের স্বপ্ন

বাদশাহ সালমানের এক দশকের শাসন এবং যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের উত্তরাধিকার ও প্রধানমন্ত্রিত্বে ‘ভিশন ২০৩০’ এখন দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও উন্নয়নমূলক পরিবর্তনের মূল কাঠামো।

৯৬তম জাতীয় দিবসে সৌদি আরব স্মরণ করছে বাদশাহ আবদুলআজিজের ঐক্যের উত্তরাধিকার, আর বর্তমান যাত্রা এগিয়ে চলেছে অর্থনীতির ভিত্তি বিস্তৃত করা, সেবা উন্নয়ন, মানবসম্পদে বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক অবস্থান জোরদার করার দিকে, ‘ভিশন ২০৩০’-এর লক্ষ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে।

দেশের ঐক্য প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যাত্রা এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে, যেখানে মানব, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সৌদি আরব গড়ে তুলছে উন্নয়নের নতুন মডেল, জাতীয় ঐতিহ্যের ভিত্তিতে, আগামী বছরগুলোতে আরও পরিবর্তনের প্রত্যাশায়।

মন্তব্য (0)