হাফ মক্কার প্রথম মহাসচিব হলেন পাকিস্তানি জেনারেল নওমান মাহমুদ
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের গঠিত হাফ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত হলেন পাকিস্তানি অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল নওমান মাহমুদ।
মূল বিষয়
AIসৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির বাস্তবায়নে অবিলম্বে পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে সম্মিলিত সামরিক বাহিনী ও সক্ষমতা দ্রুত সৌদি আরবে মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে—এমনটাই জানানো হয়েছে হাফ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের জরুরি বৈঠকের বিবৃতিতে।
এই প্রেক্ষাপটে, হাফ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নওমান মাহমুদ। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি সামরিক নেতৃত্ব, গোয়েন্দা কার্যক্রম, কৌশলগত পরিকল্পনা ও সামরিক শিক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। জোটের প্রতিষ্ঠালগ্নে তিনি কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিলেন, যেখানে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক সদস্য।
পাকিস্তানি দৈনিক 'ডন' জানিয়েছে, জেনারেল নওমান মাহমুদ জোটের সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং রাজনৈতিক সমঝোতাগুলোকে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তরের ক্ষেত্রে দিকনির্দেশক ভূমিকা রাখবেন।
মাহমুদের নিয়োগ এসেছে এমন সময়ে, যখন জোট যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়ন ও সম্মত সামরিক বাহিনী মোতায়েনের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রথম তিন বছর পাকিস্তানি নাগরিক হাফ মক্কা জোটের মহাসচিব হবেন।
'ডন' জানায়, নওমান মাহমুদ ১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর 'বেলুচ রেজিমেন্ট'-এ কমিশন পান। এরপর তাঁর সামরিক জীবন কেটেছে মাঠপর্যায়, গোয়েন্দা, প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত পরিকল্পনায়।
তিনি কোয়েটা স্টাফ কলেজ, মিশরের স্টাফ কলেজ এবং ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক। তাঁর রয়েছে যুদ্ধ অধ্যয়নে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি। কোয়েটা স্টাফ কলেজে দীর্ঘদিন প্রশিক্ষক ও প্রধান প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা তাঁকে সামরিক কৌশল ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণে বিশেষজ্ঞ করেছে।
পরবর্তীতে তিনি মাঠপর্যায়ের নেতৃত্বে আসেন। ব্রিগেডিয়ার থাকাকালে তিনি উত্তর ওয়াজিরিস্তানে একটি পদাতিক ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন, যেখানে পাকিস্তান সেনাবাহিনী সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান চালাচ্ছিল।
মাঠপর্যায় থেকে পরে তিনি পাকিস্তান গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-তে যোগ দেন এবং বিশ্লেষণ শাখার মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
'ডন' জানিয়েছে, সেখানে তাঁর কাজ ছিল জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে বৈদেশিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ, কৌশলগত সিদ্ধান্ত ও পররাষ্ট্রনীতিতে অবদান রাখা এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা।
মাঠ ও গোয়েন্দা বিশ্লেষণের অভিজ্ঞতা তাঁর নতুন দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। কারণ, হাফ মক্কা জোটের মহাসচিব হিসেবে তাঁকে তিন দেশের মধ্যে সমন্বয় এবং যৌথ রাজনৈতিক-সামরিক সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়নযোগ্য কর্মপদ্ধতিতে রূপান্তর করতে হবে।
২০১৯ সালের এপ্রিল মাসে তিনি লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি পান এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের মহাপরিদর্শক হন। আট মাস পর, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে, তিনি ১১তম কোর—যা 'পেশোয়ার কোর' নামেও পরিচিত—এর কমান্ডার নিযুক্ত হন।
'ডন' জানিয়েছে, তাঁর কোর নেতৃত্বের সময়টি ছিল পাকিস্তান-আফগান সীমান্তে অত্যন্ত স্পর্শকাতর, যখন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং পাকিস্তান সীমান্তে বেড়া নির্মাণ ও নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছিল।
২০২১ সালের নভেম্বরে তিনি ১১তম কোরের নেতৃত্ব ছেড়ে ইসলামাবাদের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির ৩৫তম প্রেসিডেন্ট হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সে পদে ছিলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান নির্বাচনের সময় ২০২২ সালে তাঁর নামও সম্ভাব্য সেনাপ্রধানদের তালিকায় ছিল বলে 'ডন' জানিয়েছে।
জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নওমান মাহমুদ তাঁর ক্যারিয়ারে 'হিলাল-ই-ইমতিয়াজ (মিলিটারি)' খেতাব পেয়েছেন, যা তাঁর নিয়োগের সময় পাকিস্তান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উল্লেখ করেছে।
পূর্ববর্তী উপজাতীয় অঞ্চলে সামরিক নেতৃত্ব, আফগান সীমান্তে স্পর্শকাতর দায়িত্ব, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত শিক্ষার অভিজ্ঞতা নিয়ে তিনি রিয়াদে এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি—একটি বহুপাক্ষিক সামরিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কাজ।
'ডন' মনে করে, তাঁর প্রধান দায়িত্ব হবে জোটের 'প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো' গড়ে তোলা, যা এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এর জন্য সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিকে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থায় রূপান্তর জরুরি।
এই দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, কারণ হাফ মক্কা জোট এখন সাংগঠনিক গঠন থেকে যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তবায়নে যাচ্ছে। জোটের প্রতিষ্ঠার সময়ই তিন দেশ সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সহযোগিতার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ জোরদার করা হবে, যাতে 'সম্মিলিত প্রতিরোধ ও প্রতিরক্ষা' আরও কার্যকর হয়।
এভাবেই, হাফ মক্কা প্রতিরক্ষা জোটের প্রথম মহাসচিব হিসেবে নওমান মাহমুদ তিন বছরের মেয়াদে দায়িত্ব নিচ্ছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা—সামরিক নেতৃত্ব, গোয়েন্দা বিশ্লেষণ ও কৌশলগত পরিকল্পনা—নতুন দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। এবার তাঁর চ্যালেঞ্জ পাকিস্তানি সামরিক ইউনিটের নেতৃত্ব ছাড়িয়ে রিয়াদ, ইসলামাবাদ ও আঙ্কারার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন প্রতিরক্ষা জোটের কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা।
