বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য নতুন বিধিমালা প্রকাশ
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নতুন বিধিমালা প্রকাশ করেছে সরকারি গেজেট, যেখানে আর্থিক বিরোধে শিক্ষার্থীদের জড়ানো ও ফলাফল আটকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।
মূল বিষয়
AIসরকারি গেজেটে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা সংক্রান্ত নতুন বিধিমালা প্রকাশ করা হয়েছে। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীর অভিভাবকের আর্থিক দেনাপাওনা সংক্রান্ত কোনো দাবিতে শিক্ষার্থীকে জড়ানো যাবে না, কিংবা তাকে শিক্ষাসামগ্রী ব্যবহারে বাধা দেওয়া যাবে না, অথবা শিক্ষা সেবা গ্রহণের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয়—এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া যাবে না। আর্থিক বিরোধের কারণে শিক্ষার্থীর ফলাফলও আটকে রাখা যাবে না। তবে প্রতিষ্ঠানের পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে আইনসম্মত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার থাকবে।
'উম আল-কুরা' সূত্রে জানা গেছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা সংক্রান্ত বিধিমালার বিস্তারিত নিম্নরূপ:
দ্বিতীয় ধারা: বিধিমালার উদ্দেশ্য
এই বিধিমালার লক্ষ্য হলো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহকে সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা, যাতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো নিশ্চিত হয়:
1- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রদান ও তাদের কার্যক্রম এবং অনুমোদিত শিক্ষা সেবা পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ।
2- শিক্ষা খাতে বেসরকারি, বিদেশি ও অলাভজনক খাতের অংশগ্রহণ ও বিনিয়োগ বাড়ানো এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করা।
3- শিক্ষার্থীদের ধর্মীয়, জাতীয়, নৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক ও দক্ষতা বিকাশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মানোন্নয়ন এবং নির্ধারিত মান ও শর্তাবলীর প্রতি তাদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করা।
4- শিক্ষা ও পরিচালনার বিভিন্ন মডেল ও বিকল্পের সুযোগ সৃষ্টি করা।
5- নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী টিউশন ফি নির্ধারণ ও পরিবর্তনের জন্য একটি নিয়ন্ত্রিত কাঠামো তৈরি করা।
6- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মন্ত্রণালয়ের তদারকি ও তাদের নিয়মনীতি মেনে চলা নিশ্চিত করা।
তৃতীয় ধারা: প্রয়োগের ক্ষেত্র
এই বিধিমালার সব ধারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর প্রযোজ্য, যদি না কোনো বিশেষ আইনে ব্যতিক্রম নির্ধারিত থাকে।
দ্বিতীয় অধ্যায়: লাইসেন্স
চতুর্থ ধারা: লাইসেন্স গ্রহণের বাধ্যবাধকতা
1- মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া কেউ কোনো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে বা পরিচালনা করতে পারবে না।
2- অনুমোদন ছাড়া কেউ নিজেকে বা অন্য কাউকে শিক্ষা সেবা প্রদানকারী হিসেবে প্রচার করতে পারবে না, কিংবা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা কার্যক্রমের বিজ্ঞাপন দিতে পারবে না।
3- অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমোদন থাকলেও তা মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্সের বিকল্প নয় এবং এই বিধিমালায় উল্লিখিত শর্ত পূরণ করতে হবে।
4- লাইসেন্সে প্রতিষ্ঠানের নাম, অবস্থান, শ্রেণি, শিক্ষা ধরণ, অনুমোদিত কার্যক্রম ইত্যাদি উল্লেখ থাকবে এবং এসব পরিবর্তন করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে।
5- সরকারি বা অনুমোদিত বিকল্প বা আন্তর্জাতিক পাঠ্যক্রমে শিক্ষা সেবা প্রদান করা যাবে, তবে তা লাইসেন্সে উল্লেখ থাকতে হবে।
6- লাইসেন্স ছাড়া কোনো শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হলে মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করে দিতে পারবে।
পঞ্চম ধারা: যোগ্যতা
1- বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার আবেদন দুটি ধাপে হবে: ক) যোগ্যতা যাচাই, খ) লাইসেন্স।
2- যোগ্যতা যাচাইয়ের আবেদন নির্ধারিত ফরম ও শর্ত অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে।
3- আবেদন সম্পূর্ণ হলে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে মন্ত্রণালয় যোগ্যতার সনদ দেবে, তবে এ সময়ে অতিরিক্ত তথ্য চাইতে পারবে।
4- যোগ্যতার সনদ এক বছরের জন্য কার্যকর থাকবে, চাইলে মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে।
5- যোগ্যতার সনদ থাকলেই প্রতিষ্ঠান চালানো, শিক্ষার্থী ভর্তি, শিক্ষা সেবা প্রদান, চুক্তি করা, ফি আদায় বা বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে না।
6- তবে বিনিয়োগ, কর্মী নিয়োগ বা নির্মাণের জন্য প্রকল্পের যোগ্যতা পর্যায়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া যাবে, তবে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে এটি এখনো অনুমোদিত নয়।
7- যোগ্যতা পর্যায়ে কোনো পরিবর্তন হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হবে।
8- যোগ্যতার সনদ বাতিল হবে: ক) চূড়ান্ত লাইসেন্স পেলে, খ) মেয়াদ শেষ হলে, গ) আবেদনকারী বাতিল চাইলে, ঘ) ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিলে, ঙ) যোগ্যতার শর্ত পূরণ না করলে।
9- যোগ্যতার সনদ থাকলেই লাইসেন্স পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই; সব শর্ত পূরণ করলেই লাইসেন্স মিলবে।
ষষ্ঠ ধারা: লাইসেন্স
1- যোগ্যতার সনদধারী ব্যক্তি সব শর্ত পূরণ করে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করবে।
2- মন্ত্রণালয় চাইলে অতিরিক্ত তথ্য বা নথিপত্র চাইতে পারবে।
3- সব তথ্য ও নথি জমা না দিলে আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হবে না।
4- লাইসেন্স পেতে যা লাগবে: ক) বৈধ বাণিজ্যিক নিবন্ধন, খ) বৈধ ভবন অনুমোদন, গ) বৈধ অগ্নি নিরাপত্তা সনদ, ঘ) অনুমোদিত প্রকৌশলী দ্বারা ভবন প্রস্তুতির প্রতিবেদন, ঙ) জাতীয় পাঠ্যক্রমের অনুমোদিত পাঠ্য পরিকল্পনা, চ) জাতীয় পরিচয় বিষয় ও পাঠদানের পদ্ধতি নির্ধারণ।
5- আবেদন জমার ৩০ দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত জানাবে।
6- আবেদন বাতিল হলে লিখিত ও যুক্তিসহ জানাতে হবে; আবেদনকারী চাইলে আপিল করতে পারবে।
সপ্তম ধারা: লাইসেন্সের মেয়াদ, নবায়ন ও কার্যক্রম বন্ধ
1- লাইসেন্সের মেয়াদ প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রম অনুযায়ী মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করবে, তবে কমপক্ষে এক বছর।
2- নবায়নের সময় প্রতিষ্ঠানটির মান, মূল্যায়ন ও ঝুঁকি বিবেচনা করা হবে।
3- লাইসেন্স শেষ হওয়ার অন্তত ৯০ দিন আগে নবায়নের আবেদন করতে হবে।
4- শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়—এমনভাবে কোনো প্রতিষ্ঠান বন্ধ বা কোনো শ্রেণি বন্ধ করা যাবে না, মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ও নির্ধারিত পরিকল্পনা ছাড়া।
অষ্টম ধারা: অনুমোদিত কার্যক্রমের পরিসর
1- অনুমোদিত কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট সেবা পরিচালনা করতে হবে।
2- অনুমোদিত হলে সহায়ক কার্যক্রম যেমন খেলাধুলা, সংস্কৃতি, প্রযুক্তি, পরিবহন, খাবার, আবাসন ইত্যাদি চালানো যাবে।
3- শিক্ষার উদ্দেশ্যের বাইরে বা শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা ও শিক্ষার মান ক্ষুণ্ণ হয়—এমনভাবে প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা যাবে না।
4- অন্য কেউ আলাদা লাইসেন্সের কার্যক্রম চালাতে চাইলে তার বৈধ অনুমতি ও মন্ত্রণালয়ের অনুমতি লাগবে।
নবম ধারা: লাইসেন্স বাতিল
1- মন্ত্রণালয় নিম্নলিখিত কারণে লাইসেন্স বাতিল করতে পারবে: ক) গুরুতর অনিয়ম বারবার হলে, খ) নির্ধারিত সময়ের বেশি কার্যক্রম বন্ধ থাকলে, গ) প্রতিষ্ঠানের আইনগত স্বত্ব হারালে, ঘ) লাইসেন্সের গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হারালে, ঙ) প্রতিষ্ঠান নিজেই বাতিল চাইলে।
2- প্রতিষ্ঠান নিজে কার্যক্রম বন্ধ বা লাইসেন্স বাতিল চাইলে, কমপক্ষে ১৮০ দিন আগে আবেদন করতে হবে।
3- আবেদনপত্রে থাকতে হবে: ক) প্রস্তাবিত বন্ধের তারিখ, খ) শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শ্রেণি, গ) শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের যথাযথভাবে জানানো, ঘ) টার্ম বা শিক্ষাবর্ষ শেষ করার পরিকল্পনা, ঙ) প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা, চ) ফি ও পাওনা নিষ্পত্তি, ছ) সনদ ও নথি হস্তান্তর, জ) নথি সংরক্ষণ বা স্থানান্তর, ঝ) কর্মী ও সহায়ক সেবার দায়িত্ব নিষ্পত্তি।
4- শিক্ষার্থীদের ক্ষতি হয়—এমন হলে মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত বন্ধের তারিখ পরিবর্তন করতে পারবে।
5- মন্ত্রণালয় নির্ধারিত তারিখে সব শর্ত পূরণ হলে লাইসেন্স বাতিল কার্যকর হবে।
6- লাইসেন্স বাতিল হলে: ক) নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ, খ) কার্যক্রম বন্ধের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, গ) লাইসেন্স বাতিলের তারিখ থেকে আর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রচার করা যাবে না, ঘ) শিক্ষার্থীর অধিকার রক্ষায় মন্ত্রণালয়কে তথ্য দিতে হবে।
7- লাইসেন্স বাতিল হলেও আগের কোনো দায় বা দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মিলবে না; মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগের অনিয়মের জন্য ব্যবস্থা নিতে পারবে।
তৃতীয় অধ্যায়: টিউশন ফি
দশম ধারা: ফি নির্ধারণ, পরিবর্তন ও ঘোষণা
1- প্রতিষ্ঠান নিজে টিউশন ফি নির্ধারণ করতে পারবে।
2- নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী ফি পরিবর্তন করা যাবে।
3- শিক্ষাবর্ষ শুরুর অন্তত ১৮০ দিন আগে মন্ত্রণালয়ের অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ফি ও অন্তর্ভুক্ত সেবার বিস্তারিত ঘোষণা করতে হবে।
