জেরুজালেমে ইসরায়েলি পদক্ষেপের নিন্দা, আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ঘোষণা
আম্মানে অনুষ্ঠিত আরব পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের শেষ বিবৃতিতে জেরুজালেমে ইসরায়েলি নীতির নিন্দা ও তা বন্ধে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ঘোষণা এসেছে।
মূল বিষয়
AIআম্মানে অনুষ্ঠিত আরব দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের শেষ বিবৃতিতে জেরুজালেমে ইসরায়েলি নীতি ও পদক্ষেপের নিন্দা জানানো হয়েছে। এসব পদক্ষেপে শহরটির আরব-ইসলামি ও খ্রিস্টান পরিচয় বদলানোর চেষ্টা চলছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে এসব পদক্ষেপ বন্ধে কার্যকর আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে—যা জর্ডানের বার্তা সংস্থা পেত্রা উদ্ধৃত করেছে—জানা যায়, জর্ডানের আহ্বানে এই বৈঠকে অংশ নেন আরব লিগের আন্তর্জাতিক কার্যক্রমবিষয়ক মন্ত্রী পর্যায়ের কমিটির সদস্য দেশগুলোর (জর্ডান, মিসর, তিউনিসিয়া, আলজেরিয়া, ইরাক, কাতার, সৌদি আরব, সোমালিয়া, ফিলিস্তিন, মরক্কো ও আরব লিগের মহাসচিব) পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা এবং ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক ও মালয়েশিয়ার প্রতিনিধিরাও। বৈঠকে জেরুজালেম ও এর ধর্মীয় স্থানে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং তা মোকাবিলায় যৌথ পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা জেরুজালেমের আরব-ইসলামি ও খ্রিস্টান পরিচয় এবং শহরটির আইনগত ও জনসংখ্যাগত অবস্থান পরিবর্তনের ইসরায়েলি নীতির নিন্দা জানান। তারা এসব পদক্ষেপকে অবৈধ, বাতিলযোগ্য এবং আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনের দখলকৃত ভূমির অংশ, যার ওপর ইসরায়েলের কোনো সার্বভৌমত্ব নেই। এটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হওয়া উচিত—১৯৬৭ সালের ৪ জুনের সীমান্ত অনুযায়ী, দুই-রাষ্ট্র সমাধান ও আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত এবং আরব শান্তি উদ্যোগের ভিত্তিতে। বিবৃতিতে নিউইয়র্ক ঘোষণার আলোকে ফিলিস্তিন সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও দুই-রাষ্ট্র সমাধান বাস্তবায়নের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে আল-আকসা মসজিদ/হারাম আল-শরীফে ইসরায়েলি লঙ্ঘন, ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান পরিবর্তনের সব চেষ্টা এবং স্থান ও সময় ভাগাভাগির প্রচেষ্টার নিন্দা জানানো হয়। এতে বলা হয়, ইসরায়েলি দখলদার বাহিনীর সহায়তায় চরমপন্থী ইসরায়েলি মন্ত্রী ও বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমবর্ধমান হামলা, মুসল্লিদের প্রবেশে বাধা ও তাদের ওপর হামলা করা হচ্ছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, আল-আকসা মসজিদ/হারাম আল-শরীফের পুরো ১৪৪ ডুনাম এলাকা কেবল মুসলমানদের উপাসনাস্থল। জর্ডানের ওয়াকফ ও ইসলামি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন জেরুজালেম ওয়াকফ প্রশাসনই এখানকার একমাত্র আইনগত কর্তৃপক্ষ।
বিবৃতিতে খ্রিস্টান ধর্মীয় স্থানে ইসরায়েলি লঙ্ঘন, জেরুজালেমে খ্রিস্টানদের ঐতিহাসিক উপস্থিতি হুমকির মুখে পড়া, পবিত্র গির্জায় প্রবেশ ও ধর্মীয় আচার পালনে বাধা, গির্জার কাজে হস্তক্ষেপ, প্রতিষ্ঠান ও সম্পত্তিতে বাধা এবং ধর্মীয় নেতাদের ওপর হামলারও নিন্দা জানানো হয়।
বিবৃতিতে জেরুজালেমের ইসলামি ও খ্রিস্টান ধর্মীয় স্থানের ওপর ঐতিহাসিক হাশেমি তত্ত্বাবধানের প্রতি সমর্থন জানানো হয়। এই তত্ত্বাবধানের ভূমিকা, শহরের আরব-ইসলামি ও খ্রিস্টান পরিচয় রক্ষা এবং ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি জনগণ ও প্রতিষ্ঠানকে টিকে থাকতে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সব ধরনের উন্নয়ন সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
বিবৃতিতে জেরুজালেম কমিটি ও এর নির্বাহী সংস্থা বায়ত মাল আল-কুদসের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়। এতে সতর্ক করে বলা হয়, জেরুজালেমে ইসলামি ধর্মীয় স্থানে ইসরায়েলি হামলা বিশ্বের দুইশ কোটি মুসলমানের অনুভূতিতে আঘাত এবং ধর্মীয় সংঘাতের আশঙ্কা বাড়াচ্ছে, যা শুধু এই অঞ্চলে নয়, বিশ্বব্যাপী শান্তি ও নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদকে অবিলম্বে জেরুজালেম ও এর ধর্মীয় স্থানে ইসরায়েলের সব অবৈধ পদক্ষেপ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। বিবৃতিতে বলা হয়, পরিকল্পিতভাবে দখলদারিত্ব জোরদার করতে ইসরায়েল বসতি সম্প্রসারণ, জমি দখল, ফিলিস্তিনি অর্থনীতি অবরুদ্ধ, জাতীয় প্রতিষ্ঠান লক্ষ্যবস্তু, বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাস বৃদ্ধি এবং ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থাকে লক্ষ্যবস্তু করছে। একই সময়ে, গাজায় যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন ও মানবিক সংকট আরও বাড়ছে, যা দুই-রাষ্ট্র সমাধান ও শান্তির সম্ভাবনা নষ্ট করছে এবং অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জেরুজালেমের আইনগত অবস্থান লঙ্ঘন করে কোনো একতরফা সিদ্ধান্ত—যেমন শহরে কূটনৈতিক মিশন খোলা বা স্থানান্তর—গ্রহণ করা চলবে না। এসব সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের পরিপন্থী বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে এসব সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসরায়েলের বেআইনি ও উত্তেজনামূলক পদক্ষেপ বন্ধে কার্যকর আন্তর্জাতিক অবস্থান গড়ে তুলতে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে। দখলদার শক্তি হিসেবে ইসরায়েলকে জেরুজালেম ও এর ধর্মীয় স্থানের ঐতিহাসিক ও আইনগত অবস্থান মেনে চলতে বাধ্য করার ওপর জোর দেওয়া হয়। একই সঙ্গে, ইসরায়েলি লঙ্ঘন নথিভুক্ত ও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও গণমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার কথা বলা হয় এবং এ উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
বিবৃতিতে ওআইসি ও আরব লিগের যৌথ মন্ত্রীসভা বৈঠক আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উচ্চ পর্যায়ের সপ্তাহে নিউইয়র্কে ডাকার আহ্বান জানানো হয়, যাতে জেরুজালেম ও এর ধর্মীয় স্থানে ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং তা মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করা যায়।
